আল-আমিন সাহাফি : বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হলো তরুণ, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা। তাদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এই প্রজন্মই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে নির্ধারণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
সম্প্রতিক ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫ অনুসারে বাংলাদেশের ১৮-৩৫ বছর বয়সী প্রায় ৮৯% তরুণই ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৯৭.২% এই নির্বাচনে ভোট দিতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছেন যা তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে ভাল ইঙ্গিত দেয়।
তবে শুধু ভোটাধিকারের উপস্থিতিই সবকিছু নয়। বাংলাদেশে পরিচালিত অন্যান্য জরিপগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ বা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছে। SANEM ও ActionAid Bangladesh‑এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে প্রায় ৮২.৭% যুবক রাজনীতি বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী নয় এবং শুধুমাত্র ১.৬% যুবক সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। এই অনাগ্রহের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক সহিংসতা বা সম্ভাব্য বিপদের ভয় এবং দুর্নীতি ও অনৈতিকতার ধারণা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুটি পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখা যায়, সমাজের তরুণেরা ভোট দিতে ইচ্ছুক হলেও রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণে তাদের আগ্রহ সীমাবদ্ধ।
অর্থাৎ ভোট দিতে ভোটার হিসেবে তারা আসে কিন্তু রাজনৈতিক দল বা কর্মকাণ্ডে তারা সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে না বা নিতে অনিচ্ছুক।
এই অবস্থা বদলাতে হলে শুধু ভোটাধিকারের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়; তরুণদের মনে রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ, মত প্রকাশ ও নেতৃত্ব গ্রহণের প্রত্যয় তৈরি করতেও গভীর মনোযোগ প্রয়োজন।
আরও একটি জরিপে দেখা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তরুণদের রাজনৈতিক পছন্দও ভিন্নমুখী। প্রায় ৩০% তরুণ এখনো ঠিক করেনি তারা কোন দলের পক্ষে ভোট দেবেন।
অনেকে নিজের রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশে অনিচ্ছুক বা undecided আছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন জানায়, তবে বিশাল অংশ এখনও অনির্ণীত।
এই বাস্তবতা থেকে আমাদের কয়েকটি বড় শিক্ষা নিতে হবে:
১. রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধুমাত্র ভোট দেয়া নয়। রাজনীতির অর্থ শুধু ভোট বা নির্বাচনী ফল নয়; এটি হলো জনজীবন, নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব স্তরে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অনেকে ভোট দিতে চাইলেও রাজনৈতিক দলের কাঠামো বা কর্মসূচিতে যুক্ত হতে ভয় পান বা মনে করেন তারা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত নয়। সেই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
২. তরুণদের অনাগ্রহ ও ভয়ের পিছনে বাস্তব কারণগুলো বোঝা প্রয়োজন। ঢাকা শহরসহ সারাদেশ থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী তরুণরা রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি, অনৈতিক আচরণ ও এমন পরিস্থিতির ভয়ে সরাসরি রাজনীতিতে আসে না। এই ভয় ভুলে গিয়ে সক্রিয় হাতে হাত মিলিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়া সহজ কাজ নয়। তবে এর সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করাটা আমাদের দায়িত্ব।
৩. তরুণদের মধ্যে নৈতিক ও গণতান্ত্রিক মনোভাব সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে দরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকা। রাজনীতির নৈতিক দিকগুলো, জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়ের উপর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের মতামত গুরুত্বপূর্ন, এটি বোঝাতে হবে।
৪. সাম্প্রতিক বাস্তবতা ও বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যুবসমাজ কেবল ভোট তথা নির্বাচনী ইভেন্টে নয় বরং প্রযুক্তি ও সমাজ মাধ্যমের মাধ্যমে রাজনীতির নান্দনিক দিকগুলোতে নিজের ভয়েস রাখতে পারছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তরুণদের জন্য নতুন ভাবনার মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে, যেখানে তারা মতামত ব্যক্ত করে এবং সমাধানের পথে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তরুণরা অপরিহার্য। তাদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু সুরক্ষা পেলে হবে না বরং তাদেরকে সক্ষম, নিরাপদ এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবেশে যুক্ত করা অত্যাবশ্যক। তরুণরা যদি শুধু ভোট দেয় এবং পিছিয়ে থাকে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে তাদের সত্যিকার অবদান কমে যাবে। তবে যখন তারা নিজেরা অংশগ্রহণ করবে, উদ্যোগ নেবে, নেতৃত্ব দেবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখনই আমরা দেশের গণতান্ত্রিক জেনারেশন গঠনের দিকে এগোতে পারব।